শিরোনাম :
বার্ন ইনস্টিটিউটে অনিয়মের অভিযোগ: অস্তিত্বহীন পদে নিয়োগ, ক্রয়ে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিতর্কে পরিচালক কোয়ার্টার ফাইনালে কে কার মুখোমুখি, খেলা কবে এনসিপির সমাবেশে হামলার অভিযোগ, সংসদে আখতার হোসেন চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড মেসির জাদুতে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে রোমাঞ্চকর জয়, শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনা শিল্পী সমিতির নতুন নেতৃত্ব: জয়ী শিবা শানু–জয় চৌধুরী প্যানেল চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ভোটযুদ্ধ আজ এখন সাইবার নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ: তথ্যমন্ত্রী ক্রোয়েশিয়াকে কাঁদিয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন

বার্ন ইনস্টিটিউটে অনিয়মের অভিযোগ: অস্তিত্বহীন পদে নিয়োগ, ক্রয়ে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিতর্কে পরিচালক

নিজস্ব প্রতিবেদক: / ১৯ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
সাবেক আওয়ামী স্বাস্থ্য মন্ত্রীর বাসায় তার সাথে বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারিতে (এনআইবিপিএস) অস্তিত্বহীন একটি পদে মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু নামে এক ব্যক্তিকে নিয়োগ, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে।

ড্রাইভার দিপু ফুলের মালা পরিয়ে দিচ্ছে পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিনকে

অভিযোগ অনুযায়ী, মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু মূলত গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ পেলেও বর্তমানে তিনি নিজেকে পরিচালকের ‘ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস-২)’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তার ফেসবুক প্রোফাইলেও একই পরিচয় উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ইনস্টিটিউটের জনবল কাঠামোতে এ ধরনের কোনো পদ নেই। তবুও পরিচালকের স্বাক্ষরিত আদেশে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—কোন আইনি ভিত্তিতে বা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে এ পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।
টেন্ডার, নিয়োগ ও প্রশাসনে দীপুর প্রভাবের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সূত্রের দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ, বিভিন্ন ক্রয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দীপু সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও তার মাসিক বেতন প্রায় ১৯ হাজার টাকা, তবুও তিনি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৬-৭৪১৪ নম্বরের একটি মিতসুবিশি এক্সপান্ডার তার মালিকানাধীন।
এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা—১৯ হাজার টাকা বেতনের একজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ির অর্থের উৎস কী?
বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
প্রাপ্ত নথিপত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবিরের সঙ্গে ‘এএমজেড হাসপাতাল’-এ পরিচালকের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং তিনি সেখানে রোগীও দেখেন।

সাবেক আওয়ামী স্বাস্থ্য মন্ত্রী নাসিমের সাথে বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, “আমি বার্ন ইউনিট ছাড়া কোনো হাসপাতালের পরিচালক না। এখন সামনে রোগী আছে, পরে কথা বলব।”
আরও অভিযোগ রয়েছে, বার্ন ইনস্টিটিউটের রোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে ওই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা হয়।
এ বিষয়ে আবারও বক্তব্য চাইলে তিনি বলেন, “আমি ২১ জুলাই পর্যন্ত ব্যস্ত থাকব। পরে অফিসে এসে কথা বলুন।”
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, অতীতে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচালকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং সে সময় তিনি বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন।

সাবেক আওয়ামী স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন কে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ স্বাচিপ এর সাথে বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন

অতিরিক্ত দামে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সম্প্রতি দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রতিটি ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা দামে কেনা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দাবি, একই ধরনের যন্ত্রের বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে হওয়ার কথা। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এর মূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে।
বার্ন ইনস্টিটিউটের এক চিকিৎসক বলেন, ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করলেও প্রতিটি মেশিনের দাম ৬৫ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। সে হিসাবে বাজারদরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে যন্ত্র কেনা হয়েছে।
টেন্ডারে অপ্রয়োজনীয় পণ্য অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ
সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অধিকাংশ পণ্যই বাজারদরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় থেকে সাত গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। এমনকি দরপত্রে এমন পণ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর বার্ন চিকিৎসায় কোনো ব্যবহার নেই।
দরপত্রে আরগোটামিন ওষুধের চাহিদা ১১ হাজার পিস এবং বাটারফ্লাই নিডেলের চাহিদা ১ লাখ ৬০ হাজার পিস দেখানো হয়।
বার্নের এক চিকিৎসক বলেন, আরগোটামিন মূলত গাইনি বিভাগের ওষুধ, বার্ন চিকিৎসায় এর কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার বাটারফ্লাই নিডেল প্রয়োজন হলেও চাহিদা দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রাশেদ রাব্বি বলেন, “এটি বড় ধরনের দুর্নীতির ইঙ্গিত। যে পণ্যের প্রয়োজন নেই, তা দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতেই এ ধরনের কৌশল নেওয়া হয়ে থাকে।”
সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪০ কোটি টাকার একটি সরবরাহ আদেশের বিপরীতে নির্ধারিত সময়ে মাত্র ১৭ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করা হলেও অর্থবছর শেষে অবশিষ্ট ২৩ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। পরে আরও ১০ কোটি টাকার পণ্য এলেও এখনো প্রায় ১৩ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, এতে সরকারি অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্য না পাওয়ায় রোগীসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
অডিট আপত্তি সামাল দিতে অর্থ সংরক্ষণের অভিযোগ
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে অডিট আপত্তি উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই আগাম অর্থ সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, যাতে আপত্তি নিষ্পত্তি করা যায়।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ
২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, আউটসোর্সিংয়ের নামে নিয়োগ পাওয়া দুই ব্যক্তি পরিচালকের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর মতো দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মধ্যে একজন মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি নিয়োগ, কেনাকাটা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কর্মচারী নিয়ন্ত্রণে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
এছাড়া পরিচালকের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে একটি কক্ষ ব্যক্তিগত স্মোকিং রুম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগ
একজন সহযোগী অধ্যাপক অভিযোগ করেন, দীপু সরকারি কোনো বৈধ পদে কর্মরত নন। আউটসোর্সিংয়ের তালিকাতেও তার নাম নেই। তারপরও তাকে সরকারি অফিস কক্ষ, ডেস্ক, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের শামিল।
তার দাবি, ২০২৪ সালের ৬ জুন জারি হওয়া সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এ ধরনের নিয়োগে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত প্রয়োজন হলেও দীপুর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।
বিদেশ সফর ও ওষুধ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের শেষদিকে একটি কোম্পানির অর্থায়নে পরিচালক যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে একটি সম্মেলনে অংশ নেন। বিমান ভাড়া, নিবন্ধন ফি এবং পাঁচতারকা হোটেলে থাকার ব্যয়সহ সব খরচ বহন করে ওই প্রতিষ্ঠান।

সাবেক আওয়ামী স্বাস্থ্য মন্ত্রীর বাসায় তার সাথে বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন

পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত ব্যয়বহুল ক্ষত নিরাময়ের ওষুধ হাসপাতালের চিকিৎসায় ব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণে ক্রয়ের অভিযোগও উঠেছে।
এছাড়া কয়েকজন ঘনিষ্ঠ চিকিৎসককে নিয়ে নেপাল, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিদেশ সফরের অভিযোগও করা হয়েছে।
পাঁচ দফা দাবিতে নতুন অভিযোগ
সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া নতুন অভিযোগে পাঁচটি দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মো. তোফায়েল আহমেদের নিয়োগ ও দায়িত্বের বৈধতা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত।
তার পদ সৃষ্টি, অর্থায়ন ও অনুমোদনের উৎস তদন্ত।
পরিচালক ডা. নাসির উদ্দীনের ভূমিকা ও অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ।
দীপুর সংশ্লিষ্ট সময়ের সব ক্রয় কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা।
তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা ও চাকরিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারছেন না। তাই বিষয়গুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


এ বিভাগের আরো সংবাদ