বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

ঝরে পড়ছে স্বতন্ত্ররা আপিলেও

বাংলা স্ক্রিন নিউজ ডেস্ক / ২২৬ বার পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে মোট ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে মোট ৩৫৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। শতকরা হিসেবে যা প্রায় ৭৩.৪ শতাংশ। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশন ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন তারা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপিল শুনানিতে ঝরে পড়ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রার্থিতা বাতিলের অন্যতম কারণ হলো— এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন সূচক তালিকায় গরমিল, হলফনামায় ত্রুটি এবং ঋণ বা বিল খেলাপি, নির্ধারিত ফরমেটে হলফনামার তথ্য দাখিল না করা, শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট দাখিল না করা ও মামলা সংক্রান্ত তথ্য গোপন। নির্বাচন কমিশনের প্রার্থিতা বাছাইয়ের তালিকা বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।

গত তিন দিনের আপিলে এখন পর্যন্ত ৩৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন এবং ৩২ জনের আপিল বাতিল হয়ে গেছে ও ৮ জনের আপিল পেন্ডিং রেখেছে কমিশন। তবে প্রার্থিতা বাতিলে বড় দলগুলো প্রভাব খাটাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। যা নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলেও মনে করছেন তারা।

সোমবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসনাত কাইয়ুম সাংবাদিকদের বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে বাদ দিতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।

তিনি জানান, প্রাথমিক যাচাইয়ে ১০ জন ভোটারের মধ্যে ছয়জনকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তদন্তে ভোটাররা ভয় পেয়ে তাকে চেনেন না বা স্বাক্ষর দেননি বলে বক্তব্য দেন। পরে আপিল করে আজ দুজন ভোটারকে নির্বাচন কমিশনের সামনে উপস্থিত করা হলে কমিশন তাদের বক্তব্য যাচাই করে আপিল মঞ্জুর করেন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন।

হাসনাত কাইয়ুম বলেন, গতকাল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নিয়ে দেখেছি, তাদের অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও ভয়াবহ। এ ধরনের কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা করলে কোনোভাবেই সুষ্ঠূ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তা নয়, আমলারা নির্বাচন পরিচালনা করছেন। যা নির্বাচনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গোপালগঞ্জ-২ আসনের বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট উৎপল বিশ্বাস বলেন, ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করার বিষয়ে এলাকার অভিভাবকদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেছিলেন, এটা কোনো কঠিন বিষয় নয়, ১ শতাংশ স্বাক্ষর সংগ্রহ হয়ে যাবে। কিন্তু এটি ছিল চরম মানসিক ও শারীরিক চাপের কাজ। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমাকে আমার নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের নাম, মোবাইল নম্বর, ভোটার সিরিয়াল নম্বর ও স্বাক্ষর প্রকাশ্যে দিতে হয়েছে। ফলে এই ভোটারদের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাইয়ের নামে কোথাও পুলিশ পাঠানো হয়েছে, কোথাও ম্যাজিস্ট্রেট, কোথাও বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দিয়ে ভয়ভীতি তৈরি করা হয়েছে।

বাতিল হওয়া ঝালকাঠি-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ রাজ্জাক আলী বলেন, ১ শতাংশ সমর্থন সংগ্রহ করা ১ লাখ ভোট পাওয়ার চেয়েও কঠিন। কারণ এখানে একজন মানুষকে প্রকাশ্যে এসে সই করতে হয়, ভোটার আইডি নম্বর দিতে হয়, ছবি দিতে হয়। এতে প্রকাশ হয়ে যায় কে কার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল হালিম সময়ের আলোকে বলেন, ১ শতাংশের বিধানটি বাতিল করা উচিত। কারণ এটা অপব্যবহার হচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে যারা স্বাক্ষর দেন, তাদের অনেক সময় ভয়ভীতি দেখায়। ভয়ভীতি দেখিয়ে বলে যে, তুমি বল এটা মিথ্যা স্বাক্ষর দিছ। এটা এক নম্বর অপব্যবহার।

দুই হচ্ছে, যদি কোনো কারণে ইলেকশন কমিশনের সার্ভার ডাউন থাকে, তখন ইলেকশন কমিশন সেটা দেখতে পারে না। না দেখে এটা বাতিল করে দেয়। আবার আরেকটা হচ্ছে যে, ১ পার্সেন্ট ভোটার ধরেন যে কোথাও হয়তো পাঁচ হাজার। এইটা থেকে মাত্র ১০ শতাংশ যাচাই-বাছাই করে। অনেক সময় একটু বেশি দিলেও সেটা প্লেস হয় না। যেমন তাসনিম জারা। তার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল বেশি দেওয়ার পরেও ওই ১০টা ধরেই তাকে বাদ দিয়েছিল প্রাথমিক বাছাই থেকে। কিন্তু আমরা পরে দেখলাম তিনি ফেরত পেয়েছেন। সো এটাকে নানাভাবে অপব্যবহার হচ্ছে।

আরেকটা জিনিস হচ্ছে, এই যে ১ পার্সেন্ট ভোটার, তারা আগে থেকেই মানুষকে মানে সবাই জেনে যাচ্ছে যে তিনি কাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন, কাকে ভোট দিচ্ছেন। কিন্তু ভোটটা তো হচ্ছে ম্যাটার অব সিক্রেসি, গোপন জিনিস। আমার ভোটটা আমি কাকে দেব, এটা তো আমি ছাড়া অন্য কেউ জানবে না। কিন্তু যদি আগে থেকেই বলে দেই ইলেকশনের আগেই যে আমি এই প্রার্থীকে সাপোর্ট করলাম আমার ভোটটা দিয়ে, তখন সেটা তো গোপনীয়তা থাকল না। সো এ সবকিছু মিলিয়ে এটা বাতিলের পক্ষে আমি।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুজনের প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের একটি বিরাট অংশ স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।

তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে বলেছিলাম, শুধু ৫০০ ব্যক্তির স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা যেন সৃষ্টি হয় এবং এসব স্বাক্ষর যেন হলফনামার মাধ্যমে দেওয়া যায়। তা হলে এখন যেভাবে ১০ জনকে ডেকে আনা হয়, কারও কারও ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে স্বাক্ষরকারীদের চাপ প্রয়োগ করার। এর মাধ্যমে একটি জালিয়াতির সুযোগ থেকে যায়। আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম, সেটি আরপিওতে সংযুক্ত হলে এ ধরনের কারসাজির আর সুযোগ ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশন এটি আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করেনি।

ইসি সূত্রে যানা যায়, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেন। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। গত ৫ জানুয়ারি আপিল গ্রহণ শুরু হয়ে ৯ জানুয়ারি শেষ হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টা থেকে কমিশনে আপিল শুনানি শুরু হয়। এদিন ১ থেকে ৭০ নম্বর আপিলের শুনানি করে ইসি। গত রোববার ৭১ থেকে ১৪০ নম্বর পর্যন্ত আরও ৭০টি আপিলের শুনানি অনুুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল সোমবার ১৪১ থেকে ২১০ নম্বর আপিল, আজ মঙ্গলবার ২১১ থেকে ২৮০ নম্বর আপিলের শুনানি হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ২৮১ থেকে ৩৫০ নম্বর, বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ৩৫১ থেকে ৪২০ নম্বর, শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ৪২১ থেকে ৪৯০ নম্বর, শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ৪৯১ থেকে ৫৬০ নম্বর ও রোববার (১৮ জানুয়ারি) ৫৬১ থেকে অবশিষ্ট সব আপিলের শুনানি করবে নির্বাচন কমিশন।

ইসি জানিয়েছে, শুনানি শেষে ফলাফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। এ ছাড়া নির্বাচন ভবনের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকেও অনুলিপি সংগ্রহ করা যাবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ২,০৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এরমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে।


এ বিভাগের আরো সংবাদ