গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাকর্মীদের এ ধরনের কার্যক্রম ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে কয়েকটি স্থানে পাল্টা বিক্ষোভ, ভাঙচুর, আগুন ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল ও জুলাই আন্দোলনের নেতারা।
দলীয় কার্যালয় খোলা, পতাকা উত্তোলন, স্লোগান ও ফুল দিতে দেখা যায়। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের কারাবন্দি নেতাকর্মীরাও জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এ বাস্তবতা থেকে দলটির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তারা যদি নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের অবস্থান নিলেও মাঠপর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী-সমর্থক কৌশলগতভাবে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, নিষিদ্ধ অবস্থা থেকে যেন আওয়ামী লীগ মুক্তি পায়, সেজন্য দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে নমনীয় আচরণ করতে পারে। আর এই বাস্তবতা থেকেই হয়তো তারা হঠাৎ মাঠে নেমেছে।
আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরাও বিএনপির বিজয়ে নিজেদের অবদান দেখছে। তারা আশা করছেন, বিএনপি ভবিষ্যতে রাজনীতির মাঠ উন্মুক্ত করবে।
সেই আশার প্রতিফলন হিসেবেই নির্বাচনের পরই রাজনীতিতে সক্রিয় হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা, এমনটাই মনে করছেন কেউ কেউ।
সাবেক এমপিসহ ৩ নেতার জামিন গত ৯ মাস কারাবাসের পর জামিন পেয়েছেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বরিশাল-৫ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ। একইসঙ্গে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে বরিশাল মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বরিশাল মহানগরের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন।
গত মঙ্গলবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। পরদিন বুধবার সকালে আদালত থেকে মুক্তি পান তিন নেতা। বরিশাল সদর থানার সরকারি নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) মো. হুমায়ুন কবির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২৫ সালের ১৭ মে ঢাকার বাসা থেকে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন জেবুন্নেছা আফরোজ। পরে তাকে বরিশালের অন্তত ৬টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বিভিন্ন স্থানে খুলেছে আ.লীগের কার্যালয়
কুড়িগ্রামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গুঁড়িয়ে দেওয়া কার্যালয়ে ব্যানার টানিয়েছেন দলটির কর্মীরা। এ ছাড়া সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে জেলা শহরের শাপলা চত্বর এলাকায় দলটির জেলা কার্যালয়ের ধ্বংসস্তূপে এ ব্যানারটি ঝুলতে দেখা যায়। পরে সেখানে উপস্থিত হয়ে ব্যানার খুলে ফেলার পাশাপাশি কার্যালয়ের টিনের বেড়া ভেঙে দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
একইদিন ভোরে শরীয়তপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বন্ধ থাকা জেলা কার্যালয় খুলেছে দলটির নেতাকর্মীরা। এসময় কার্যালয়ের ভেতরে শেখ মুজিবুর রহমান ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে দেন তারা। তবে কিছুক্ষণ পর ছবিগুলো আর কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বুধবার সকাল সাতটার দিকে ছাত্রলীগের ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতাকর্মী তালা ভেঙে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ঢোকেন। এরপর ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে কার্যালয়টিতে একটি ব্যানার টাঙিয়ে সটকে পড়েন তারা।
তাছাড়া বুধবার ভোরে রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো হয়েছে। এ ছাড়া দলীয় কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়’ লেখা একটি ব্যানারও টাঙানো হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সকালে দুই-তিনজন তরুণ দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে কার্যালয়ের সামনে একটি ব্যানার টাঙান।
এদিকে দলীয় স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হবিগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। গতকাল ভোরে হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল এলাকায় অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে প্রায় ১০-১২ জন নেতাকর্মী বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন।
এদিন দুপুর ২টার দিকে নারায়ণগঞ্জে যুবলীগের পাঁচ-ছয়জন কর্মী জড়ো হয়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেন। পরে তারা জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাইসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তা ছাড়া নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায়ও আওয়ামী লীগের শাখা কার্যালয়ে শেখ মুজিব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কয়েকটি ছবি টাঙিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
জয়পুর জামরুলতলা এলাকায় মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। বুধবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কার্যালয়ে টাঙানো সেসব ছবি ও পতাকা খুলে ফেলা হয়।
কার্যালয় খোলার আরও কয়েকটি ঘটনা
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরদিনই পঞ্চগড় সদরে চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিসের তালা খুলে ঢুকে পড়েন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ খান। পটুয়াখালী দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে।
একইদিন বিকালে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
খুলনা জেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক মাহমুদুল হাসান ফয়জুল্লাহ অভিযোগ করে বলেন, ‘‘বিএনপির ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে চাইছে। তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কাজে লাগিয়েছে। এখন তারা তার প্রতিদান নিচ্ছে। তবে তারা সফল হবে না। তাদের প্রতিরোধ করা হবে।’
বরগুনার বেতাগী উপজেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনাটি ঘটে ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর।
জেলার এনসিপি নেতা মীর নিলয় বলেন, ‘একটি দল তাদের এখন পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা এটা হতে দেব না।’
কার্যালয় খোলার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে বলেন, ‘আমাদের নেত্রীর নির্দেশনা হলো আমাদের পোড়া বাড়িতেও যেতে হবে। ড. ইউনূসের বিদায়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে, তাই নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে যাচ্ছে। কার্যালয় খুলছে।’
আর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীরা মনে করেন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তারা গণতান্ত্রিক আচরণ করবে। তাই আমাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস খুলছে। তবে আমাদের নেত্রীর নির্দেশনা আছে যে পার্টি অফিস খুলতে হবে। সেখানে বসতে হবে। আমরা স্বাভাবিক রাজনীতি করতে চাই। আমাদের পার্টি তো নিষিদ্ধ করা হয়নি।’
এদিকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অফিস খোলার জন্য সরাসরি বিএনপির সহযোগিতাকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি আবার ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ফিরিয়ে আনতে চায়। আমরা দেখেছি বিএনপি নেতারাও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলতে সহায়তা করছেন।’
তবে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অফিস খুলছে, এরমধ্যে আমি খারাপ কিছু দেখি না। যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার হবে। তারা শাস্তি পাবে। কিন্তু কোনো দলের রাজনীতি আমি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই।’
অন্যদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিষয়ে বিএনপি সরকারের অবস্থানের বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা আমরা পলিটিক্যালি পরে আপনাদের জানাব। সরকারে আলোচনার পর জানাব।’
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ঢালাও বলা ঠিক হবে না।’