ঈদ আমাদের জন্য নিছক আনন্দের দিন নয়; ঈদ হলো ইবাদতের পর পুরস্কারের দিন। এক মাস সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াত ও আত্মসংযমের পর আল্লাহ তাআলা ঈদের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেছেন। এখানে আনন্দ আছে—কিন্তু গুনাহের অনুমতি নেই; হাসি আছে —কিন্তু সীমালঙ্ঘন নেই; খুশি আছে—কিন্তু আল্লাহর নাফরমানি নেই।
এই ঈদ আমাদের শিক্ষা দেয়—এডকতা, ভ্রাতৃত্ব, কৃতজ্ঞতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা। ধনী-গরিব, বড়-ছোট—সবাই যেন এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজেকে সমান মনে করি।
ঈদুল ফিতর হলো—রমজান মাস পূর্ণ করার পর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়ার দিন। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?
আলেমগণ বলেন, ‘ঈদ’ শব্দটি এসেছে ‘আউদ’ থেকে, যার অর্থ বারবার ফিরে আসা। ‘ফিতর’ অার্থ—রোজা ভাঙা।
যেহেতু এই দিনে রোজার সমাপ্তি ঘটে এবং আল্লাহ তাআলা রমজানের ইবাদতের প্রতিদান দেন, তাই একে বলা হয় ঈদুল ফিতর।
ঈদের দিনের ফজিলত :আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন
‘রমজানের শেষ রাতে, অর্থাৎ ফিতরের রাতেই হয় ‘লাইলাতুল জাইযাহ’—পুরস্কারের রাত।’
এরপর যখন ঈদের সকাল হয়, আল্লাহ তাআলা সব দেশে ফেরেশতাদের প্রেরণ করেন। তারা পৃথিবীতে নেমে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে এমন উচ্চ কণ্ঠে ডাক দিতে থাকেন—যে ডাক মানুষ ও জিন ছাড়া আল্লাহর সৃষ্ট সবকিছুই শুনতে পায়।
‘হে মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত! তোমরা বেরিয়ে এসো এমন এক মহান ও দয়ালু রবের দরবারে—যিনি প্রচুর দান করেন এবং বড় বড় গুনাহও ক্ষমা করে দেন।’
যখন বান্দারা ঈদগাহের দিকে বের হয়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন
‘যে শ্রমিক তার কাজ সম্পন্ন করেছে, তার প্রাপ্য কী?’
ফেরেশতারা উত্তর দেন
‘হে আমাদের রব ও মালিক! তার প্রাপ্য হলো—তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করা।’
তখন আল্লাহ তাআলা বলেন
‘হে আমার ফেরেশতারা! তোমরা সাক্ষী থাকো—আমি রমজান মাসের রোজা ও রাতের ইবাদতের প্রতিদান হিসেবে তাদের জন্য আমার সš‘ষ্টি ও ক্ষমাকে নির্ধারণ করেছি।’
এরপর আল্লাহ তাআলা বান্দাদের উদ্দেশে বলেন
‘হে আমার বান্দারা! আজ তোমরা আমার কাছে চাও। আমার ইজ্জত ও মহিমার কসম! আজ তোমরা তোমাদের আখিরাতের জন্য যা চাইবে, আমি তা অবশ্যই দেব। আর দুনিয়ার ব্যাপারে যা চাইবে, আমি তাতেও তোমাদের কল্যাণের দিকেই দৃষ্টি দেব।’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন
‘আমার ইজ্জতের কসম! যতদিন তোমরা আমাকে ভয় করে চলবে, আমি তোমাদের ভুলত্রুটি ঢেকে রাখব। আমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমাদের লাঞ্ছিত করব না, সীমা লঙ্ঘনকারীদের সামনে তোমাদের অপমান করব না।’
এরপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন
‘ফিরে যাও—তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। তোমরা আমাকে সš‘ষ্ট করেছ, আর আমিও তোমাদের প্রতি সš‘ষ্ট হয়েছি।’
এ কথা শুনে ফেরেশতারা আনন্দিত হন এবং খুশি হন এই ভেবে—রমজান শেষে ঈদের দিনে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে কী অপার দান ও সম্মান দান করছেন। [ বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪২১]
এই হাদিস আমাদের জানিয়ে দেয়—ঈদের দিন শুধু আনন্দের নয়; বরং আল্লাহর ক্ষমা, সš‘ষ্টি ও পুরস্কার পাওয়ার এক মহামূল্যবান দিন।
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ রহ. বলেন আল্লাহ তাআলা ঈদুল ফিতরের দিনে জান্নাত সৃষ্টি করেছেন, ঈদুল ফিতরের দিনে জান্নাতের ‘তূবা’ বৃক্ষ রোপণ করেছেন, ঈদুল ফিতরের দিনে ওহী বহনের জন্য জিবরাঈল আ.-কে মনোনীত করেছেন এবং ফেরাউনের জাদুকরেরা ঈদুল ফিতরের দিনেই ক্ষমা লাভ করেছিলেন। [ গুনিয়াতুত তালেবীন : ২/২৯]
ঈদের দিনের আমল: আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য পুরস্কারের দিন। এই দিনের প্রধান আমলগুলো হলো: ঈদের নামাজ আদায়ের আগে গোসল করা ও মিসওয়াক করা, সাধ্যমতো নতুন বা উত্তম পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদুল ফিতরের দিন কিছু মিষ্টি জাতীয় খাবার (যেমন- সেমাই) খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া, যাওয়ার পথে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা, ঈদগাহে এক পথে যাওয়া ও অন্য পথে ফেরা
ঈদের দিনের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও আমলসমূহ:
ফিতরা আদায়: ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা (সাদাকাতুল ফিতর) আদায় করা ওয়াজিব, যাতে দরিদ্ররাও আনন্দের অংশীদার হতে পারে
তাকবির পাঠ: ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা সুন্নাহ: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ”
খাবার খাওয়া: ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজের আগে কিছু মিষ্টি খেয়ে বের হওয়া সুন্নাহ
ঈদের নামাজ: ওয়াজিব বা সুন্নাহ (মতভেদে) অনুযায়ী খোলা ময়দানে গিয়ে ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করা
সালাম ও মুসাফাহা: ঈদের দিন পারস্পরিক সালাম, মুসাফাহা ও কোলাকুলির মাধ্যমে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করা
আত্মীয়তার সম্পর্ক: আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অসুস্থ মানুষের খোঁজখবর নেওয়া
দান-সদকা: ইয়াতিম ও অভাবী মানুষকে খাবার খাওয়ানো বা আর্থিক সহায়তা করা
বেশি বেশি শোকর আদায়: রমজানের ইবাদতের তাওফিক দেওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা
বর্জনীয় বিষয়:
ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম এখন টিভি [৪]। এছাড়া ঈদের দিন গান-বাজনা, অপচয়, বেপর্দা চলাফেরা ও অমুসলিমদের সংস্কৃতির অনুকরণ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাই কে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ ভাগাভাগি করে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করার তৌফিক দিক।আমিন
মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ চিশতী
লেখক গবেষক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবীদ