করছে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও ক্রীড়া সম্পর্ক, যা এখন খাদের কিনারায়। ভারতের মাটিতে নিরাপত্তাঝুঁকির অজুহাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে— তারা ভারতে খেলতে যাবে না। অন্যদিকে, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি ভারতকে ‘নিরাপদ’ প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে বিশ্বকাপের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার সুতায়।
মঙ্গলবার দুপুরে বিসিবি ও আইসিসি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হওয়া এই সভায় বিসিবি তাদের অবস্থানে ছিল হিমালয়ের মতো অটল। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এবং সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেনসহ নীতি-নির্ধারকেরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দল সেখানে পাঠানো সম্ভব নয়।
বিসিবির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এটি কেবল বোর্ডের সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশ সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশনা। জাতীয় নিরাপত্তা এবং খেলোয়াড়দের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনো ধরনের আপস করবে না ঢাকা। বিসিবি অনুরোধ জানিয়েছে, কলকাতার ইডেন গার্ডেন এবং মুম্বাইয়ের ম্যাচগুলো যেন শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হয়।
আইসিসির প্রধান নির্বাহী সংযোগ গুপ্তার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল দাবি করেছে, ভারতে বাংলাদেশ দলের জন্য যে ঝুঁকি রয়েছে তা ‘লো মডারেট’ বা ‘নিম্ন মাঝারি’ পর্যায়ের। তারা মনে করে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।
তবে বিসিবি এই যুক্তিকে ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিসিবির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে আইসিসির নিজস্ব ‘ইন্টারনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে’ বলা হয়েছে যে, ভারতের উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর নিশানায় কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান থাকতে পারেন, সেখানে দল পাঠানো কি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়? শুধু খেলোয়াড় নয়, সাথে যাওয়া বোর্ড কর্মকর্তা, সংবাদকর্মী এবং হাজার হাজার সমর্থকের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? একজনের আম্পায়ারিং (শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ) করা আর পুরো একটি জাতীয় দলের সফরের নিরাপত্তা যে এক নয়, তা কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে মিরপুর।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে। উগ্রপন্থীদের দাবির মুখে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) যখন মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়, তখনই বিপদের ঘণ্টা বাজে। বিসিবি মনে করছে, যদি একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দল উগ্রবাদীদের চাপে তাদের সেরা খেলোয়াড়কে বাদ দিতে পারে, তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশ দলকে কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। বিসিবির মতে, উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে বিসিসিআই-এর এই নতি স্বীকার প্রমাণ করে যে ভারতের মাঠ এখন বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ নয়।
এই সংকটে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর শোনা গেছে সরকারের পক্ষ থেকে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশের অবস্থান। তিনি বলেন, মোস্তাফিজ ইস্যুতে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতি স্বীকার এবং ভারতে বিরাজমান বাংলাদেশবিরোধী অব্যাহত প্রচারণা আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে আমাদের খেলোয়াড় ও দর্শকেরা সেখানে চরম ঝুঁকিতে থাকবেন।
আসিফ নজরুল আরও যোগ করেন, দেশের খেলোয়াড় ও দর্শকদের নিরাপত্তা এবং দেশের মর্যাদার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করতে পারি না। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। প্রয়োজনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমরা বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকব, তবু অনিরাপদ ভেন্যুতে যাব না।
বিপিএলের চলতি আসরকে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে ঘোষণা করেছিল বিসিবি। ২৩ জানুয়ারি ফাইনাল শেষে ২৫ জানুয়ারি ভারতের উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার কথা ছিল টাইগারদের। কিন্তু হঠাৎ এই নিরাপত্তা সংকট সব পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিয়েছে। নির্বাচক কমিটি দল ঘোষণা করলেও খেলোয়াড়দের মনে এখন উৎকণ্ঠা—তারা কি আদৌ বিশ্বমঞ্চে নামতে পারবেন?
বিসিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আইসিসির পূর্ণ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার আছে কোনো নির্দিষ্ট ভেন্যু নিয়ে আপত্তি তোলার। যদি তথ্যপ্রমাণসহ নিরাপত্তার অভাব দাবি করা হয়, তবে আইসিসি তা এড়িয়ে যেতে পারে না। যদি আইসিসি বিকল্প ভেন্যু না দেয়, তবে বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ে আপিল করার আইনি ভিত্তি রাখে।
বিসিবি আশাবাদী যে, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে আইসিসি হয়তো শ্রীলঙ্কাকে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করবে। কারণ, এর আগেও ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের কারণে অনেক ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সরানোর নজির রয়েছে।
যদি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তবে তা বৈশ্বিক ক্রিকেটের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ক্রিকেটে বাংলাদেশের যে বিশাল দর্শকপ্রিয়তা, তা ছাড়া বিশ্বকাপের জৌলুস হারাবে। কিন্তু ক্রীড়া উপদেষ্টার ভাষায়—সাময়িক এই ক্ষতি মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু দেশের সম্মান এবং জীবনের ঝুঁকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এখন সবার নজর আইসিসির পরবর্তী বার্তার দিকে। আইসিসি কি ভারতের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশকে ছাড়াই টুর্নামেন্ট চালাবে, নাকি বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচগুলো স্থানান্তর করবে? আজ এবং আগামীকালের দিনটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
ক্রিকেট এখন আর কেবল মাঠের লড়াই নয়, এটি এখন ভূ-রাজনীতি এবং আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ভারতের ‘মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি’র যে দাবি বিসিবি তুলেছে, তার পেছনে শক্তিশালী যুক্তি ও সরকারি সমর্থন রয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে ঘটা অনভিপ্রেত ঘটনাটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে। এখন বল আইসিসির কোর্টে—তারা কি ক্রিকেটের সংহতি বজায় রাখবে, নাকি নিরাপত্তার অজুহাতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে একতরফা সিদ্ধান্তে অনড় থাকবে? বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছে মিরপুর ও দুবাইয়ের (আইসিসি সদর দপ্তর) পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।